স্থাপিত: ১৯৭২ ইং, EIIN: 126255
ই-মেইল: [email protected]

কলেজের ইতিহাস

রাজশাহী জেলা সদর হইতে প্রায় ২৫ মাইল দক্ষিণ পূর্বে ঐতিহাসিক উত্তরবঙ্গের মুসলিম কৃষ্টি ও কালচারের পীঠস্থান বাঘা অবস্থিত। ১৫০০খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকে মুসলিম বাংলার স্বাধীন সুলতানদের আশ্রয়ে রাজশাহীতে যাহারা ইসলাম প্রচারে ব্রত  হইয়াছিলেন তাহাদের মধ্যে সর্বপ্রথম বাঘার হযরত শাহ্ মোয়াজ্জেম দৌলা দানেশ মন্দ ওরফে শাহ্দৌলা (রঃ) নিঃসন্দেহে অন্যতম শ্রেষ্ঠ। এই তাপস কুলরবি ওলিকুল শিরোমনি ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সুদূর বাগদাদ শরিফ হইতে পাঁচজন শিশ্যসহ এই জঙ্গলাকীর্ণ বাঘায় ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে শুভাগমন করত।প্রথম আস্তানা স্থাপনপূর্বক উত্তরবঙ্গের অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে আলোর দেখা মেলাতে ইসলাম প্রচারে ব্রত হন। উক্ত দরবেশের কার্যকলাপে আকৃষ্ট হইয়া তৎকালীন ভারত সম্রাট শাহজাহান দরবেশের ভরণপোষণ শিক্ষা বিস্তার ও ধর্ম প্রচার এর জন্য কিছু ভূসম্পত্তি  দরবেশকে দান করেন যাহার কিয়দাংশ লইয়া পরবর্তীকালে বাঘা ওয়াকফ এস্টেটের সৃষ্টি হয়।

১৯২৩-২৪খ্রিস্টাব্দে গৌড় এর  বাংলার স্বাধীন সুলতান নাসিরুদ্দিন  নশরত শাহ্ কারুকার্য খচিত একটি মসজিদ নির্মাণ ও একটি মনোরম দীঘি খনন করেন। যাহা এখনো এতদ্ব অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের নিদর্শন হিসেবে রয়েছে। 

হযরত শাহ্দৌলা (রহঃ)’র মৃত্যুর পর তদীয় পুত্র হযরত শাহ্ সুফি মাওলানা আব্দুল হামিদ দানিশ  মন্দ কুতুবুল আফতাব (রঃ) পিতা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মক্তব মাদ্রাসাকে একটি আরবি কলেজে উন্নীত করেন, যাহা পরবর্তীকালে তৎকালীন সমগ্র বাংলার একটি আদর্শ ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। যেখানে কোরআন, হাদিস, ইছূল ও ফিকা শিক্ষা  দেওয়া হইত এবং দেশ-বিদেশ হইতে আগত ছাত্র এই কলেজে অধ্যয়ন করিত।

বাঘার মাটি উক্ত দরবেশ আউলিয়ার পদরেণু ধারণ করিয়া সুদীর্ঘ অতীত হইতে ইসলামী ভাবধারা তাহজিব তামাদ্দুনের লালন কেন্দ্র হিসেবে কৃর্তিত হইয়া আসিতেছিল এবং ধন- ধান্যে জ্ঞানগর্ভে মহিমান্বিত ছিল। দুঃখের বিষয় কালের নির্মম পরিহাসে গৌরবময় ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থান আজ বৃৃস্মিতির অতল গর্ভে নিম্নজ্জিত।

বাঘার ঐতিহাসিক জামে মসজিদ মনোরম দিঘলিয়ার দরবেশ গনের পবিত্র মাজার জিয়ারত ও দর্শন লাভের জন্য দূরদূরান্ত হইতে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে বহু ভক্তপ্রাণ মানুষ আজও  আসিয়া পুণ্য সঞ্চয় করিয়া থাকেন।

১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের  ভূমিকম্পে বাঘা শাহী মসজিদ দশ গম্বুজ বিশিষ্ট  ছাদ বসিয়া পড়ে এবং ইহার সঙ্গে বাঘা দরগাহ শরীফের পাঠাগার সহ বহু ইমারত ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। পরাধীনতার নাগপাশে আবদ্ধ হওয়ার সঙ্গে  বাঘা তথা ভারতবর্ষে মুসলিম কৃষ্টি ও কালচারের ওপর চরম আঘাত আসে। ১৯৫৬ সালে বাঘা ওয়াক্ফ এষ্টেট সরকারি হুকুম দখলে চলিয়া গেলে উক্ত স্থানের উন্নয়নের পথ বন্ধ হইয়া যায়।

এদিকে ১৯৭০ ইং সালের ৬ ই এপ্রিল বাঘা হাই স্কুল মাঠে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।  উক্ত জনসভায় উপস্থিত ছিলেন, শহীদ কামরুজ্জামান ( হেনা), শহীদ নজমুল হক সরকার ( চারঘাট- বাঘা), ( লালপুরের এম. এল. এ প্রার্থী) প্রভাস লাহিড়ী, লাগরাম মাঝি, ডাঃ আলাউদ্দিন( এম. পি প্রার্থী) স্থানীয় নেতা হারুন- অর- রশিদ সরকার সহ তৎকালীন উত্তরবঙ্গের আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। উক্ত সভায় ঘোষণা করা হয় যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে বাঘায় একটি কলেজ ও চারঘাট বাঘা ঈশ্বর্দি পর্যন্ত রাস্তা তৈরি করা হবে। তৎকালীন সরকারের বহু ষড়যন্ত্র ও বাধা-বিপত্তির পর ৭-১২-১৯৭০ ইং তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৯৫% ভোট পেয়ে ক্ষমতা পেল না। ফলে দেশে  অ- সহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। বিভিন্ন ধরনের বিশৃঙ্খলা এবং আইন শৃঙ্খলার চরম অবনতির মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। দীর্ঘ ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ইং সালে দেশ স্বাধীন হয়। যুদ্ধ চলাকালীন সময় নজমুল হক সরকার শহীদ হন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এবং বর্তমান ইসলামী রেনেসাঁর যুগ সন্ধিক্ষণে দেশবাসী আশা করেন যে, বর্তমান জনপ্রিয় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বাঘা তথা উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়  পীঠস্থান তাহার লুপ্ত গৌরব ফিরিয়া পাইবে।

 অন্যদিকে ১৯৭২ সালের অক্টোবরের প্রথম থেকেই মনিগ্রামে  শহীদ নজমুল হক কলেজ করার জন্য কয়েকজন চক্রান্তকারী ও সুবিধাবাদী ব্যক্তির  প্ররোচনায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। একই দিনে ১০ নভেম্বর ১৯৭২ ইং তারিখ অ্যাডভোকেট আবদুল হান্নান এবং অধ্যক্ষ  তাফিরউদ্দিন, ডাক্তার আলাউদ্দিন সাহেব ইশারায় রাজশাহী সরকারি কলেজে এসে কিছু অভিজ্ঞ ব্যক্তির সহিত পরামর্শ করে পাঁচজন সদস্য নিয়ে অর্গানাইজেশন কমিটি গঠন করেন এবং বাঘা মহাবিদ্যালয় নামে বাঘায় কলেজ স্থাপন করেন। ডাক্তার আলাউদ্দিন এম. পি ( সভাপতি), মনিরুল ইসলাম (মোতাওয়াল্লী) বাঘা ওয়াকফ্ এস্টেট, আব্দুস সামাদ, হাজী মোকাররম, শফির উদ্দিন ( অধ্যক্ষ) পরিচালনায় অ্যাডভোকেট আবদুল হান্নান। মনিরুল ইসলাম বাঘা ওয়াকফ্  স্টেটের মোতাওয়াল্লী হওয়া সত্ত্বেও দিঘী বর্তমান কলেজের জায়গা ও ওয়াক্ফ স্টেটের অন্যান্য সম্পত্তি দখল পান নাই। মোতাওয়াল্লী জনাব মনিরুল ইসলাম তিনি দীর্ঘদিন জেলা মুসলিম লীগের সেক্রেটারি ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার কোলাবরেট কেসে তিনি কয়েক বছর রাজশাহীর জেলখানায় আবদ্ধ ছিলেন।মনিরুল ইসলামকে টাউন জামিনে বের করে স্থায়ী জামিন ও কেস থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করা হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যায় অ্যাডভোকেট আবদুল হান্নান, তাফিরউদ্দিন ও  আজমল সাহেব সহ তিনজন উনার বাসায় গিয়ে বিভিন্ন মত বিনিময় হয়। পরবর্তীতে মোতাওয়াল্লী সাহেব সহ মিশন হাসপাতাল এর উত্তরে ডাক্তার আলাউদ্দিন এম. পি সাহেবের বাসায় রাত ১০ টার পর কলেজের অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করা সহ বিশদ ভাবে। 

এভাবে অনেক মত বিনিময় ও তদবির করার পর বিধি মোতাবেক ওয়াকফ্  এস্টেটের মধ্যে ১৫ বিঘা জমি কলেজকে দানপত্র করতে সম্মত হন। ফলে দীঘা সহ ওয়াক্ফ স্টেটের দখলে চলে আসে।

 এর দুই বছর পর অ্যাডভোকেট আব্দুল হান্নান সাহেবের সঙ্গে আলোচনা পূর্বক অধ্যক্ষ জনাব তফিরউদ্দিন  সাহেব রেজুলেশন করে বাঘা মহাবিদ্যালয়ের পরিবর্তে শাহ্দৌলা কলেজ নামকরণ করেন।

৭ই মার্চ ১৯৭২ সালে ডাক্তার আলাউদ্দিন ( এম. পি) সাহেব বাঘা মাদ্রাসায় ফিতা কেটে কলেজের প্রথম ক্লাস উদ্বোধন করেন। সেখানে অধ্যক্ষ তফির উদ্দিন সহ তৎকালীন ১ নম্বর বাজুবাঘা ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব প্রাপ্ত চেয়ারম্যান হারুন- অর-রশিদ সরকার, নুরুল হুদা সরকার খোরশেদ আলী মিঞা (কমার্স), ২১ মার্চ নাজির উদ্দিন( রাষ্ট্রবিজ্ঞান), ২৩ মার্চ ভবেশ পান্ডেকে ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়। শিক্ষকদের মাত্র ১০০ টাকা সম্মানী প্রদান করা হত।

বাঘার লুপ্ত গৌরব ফিরিয়ে পাওয়ার লক্ষ্যে এতদঞ্চলের জনসাধারণ বাঘা এষ্টেটের তৎকালীন  মোতাওয়াল্লি সাহেব ও স্থানীয় প্রশাসন মন্ডলীর পৃষ্ঠপোষকতায় বাঘা দরগাহ শরীফের আঙ্গিনার মধ্যে ১৫ বিঘা জমির ওপর( মোতাওয়াল্লী সাহেবের দান)  বাঘায় হযরত শাহ্দৌলা (রহঃ) কলেজ প্রতিষ্ঠিত হইয়া এতদঞ্চলের উচ্চ শিক্ষা বিস্তারের পথ সুগম করিয়াছে। শাহ্দৌলা (রহঃ) কলেজ বাঘা দরগাহ শরিফের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দরগাহ শরীফ ও কলেজের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নতি বিশেষ ভাবে কাম্য। 

বর্তমানে শিক্ষক-কর্মচারির সংখ্যা ৭৫ জন। এর মধ্যে কর্মচারি রয়েছে ১৩জন। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২হাজার ৬৪১জন।

বিজ্ঞপ্তিঃ